সূরা হুমাযা পবিত্র কোরআনে ১০৪ নম্বর সূরা। এর অর্থ : পরনিন্দাকারী।
এর আয়াত সংখ্যা নয়। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ ও পবিত্র কোরআনের
৩০তম পারায় অবস্থিত।
সূরা
হুমাযা
وَیۡلٌ لِّکُلِّ
ہُمَزَۃٍ لُّمَزَۃِۣ ۙ ١ الَّذِیۡ جَمَعَ مَالًا وَّعَدَّدَہٗ ۙ ٢ یَحۡسَبُ اَنَّ مَالَہٗۤ
اَخۡلَدَہٗ ۚ ٣ کَلَّا لَیُنۡۢبَذَنَّ فِی الۡحُطَمَۃِ ۫ۖ ٤ وَمَاۤ اَدۡرٰىکَ مَا الۡحُطَمَۃُ ؕ
٥ نَارُ اللّٰہِ الۡمُوۡقَدَۃُ ۙ ٦ الَّتِیۡ تَطَّلِعُ عَلَی الۡاَفۡـِٕدَۃِ ؕ ٧ اِنَّہَا
عَلَیۡہِمۡ مُّؤۡصَدَۃٌ ۙ ٨ فِیۡ عَمَدٍ مُّمَدَّدَۃٍ ٪ ٩
সূরা
হুমাযা
অর্থ:
বহু দুঃখ আছে প্রত্যেক এমন ব্যক্তির, যে পেছনে অন্যের
বদনাম করে (এবং) মুখের উপরও নিন্দা করে। যে অর্থ সঞ্চয়
করে ও তা বারবার
গুণে দেখে। সে মনে করে
তার সম্পদ তাকে চিরজীবি করে রাখবে। কক্ষণও নয়। তাকে তো এমন স্থানে
নিক্ষেপ করা হবে, যা চূর্ণ-বিচূর্ণ
করে ফেলে। তুমি কি জান সেই
চূর্ণ-বিচূর্ণকারী জিনিস কী? তা আল্লাহর প্রজ্বলিত
আগুন। যা হৃদয় পর্যন্ত
পৌঁছে যাবে। নিশ্চয়ই তা তাদের উপর
আবদ্ধ করে রাখা হবে। যখন তারা (আগুনের) লম্বা-চওড়া স্তম্ভসমূহের মধ্যে (পরিবেষ্টিত) থাকবে।
সূরা হুমাযাতে যে তিনটি কঠিন গুনাহের কথা বর্ণনা করা হয়েছে
এই সূরায় তিনটি
জঘন্য গুনাহের শাস্তি ও তার তীব্রতা
বর্ণিত হয়েছে। গুনাহ তিনটি হচ্ছে- جَمَعَ مَالًا هُمَزَة
لُمَزَة (‘হুমাযাহ,
লুমাযাহ ও জামাআ মালা’)। অর্থাৎ, কাউকে
দোষারোপ করা, পেছনে নিন্দা করা ও সম্পদ জমা
করা।
আয়াতে ‘হুমাযাহ’ ও ‘লুমাযাহ’ দু'টি শব্দ ব্যবহার
করা হয়েছে। অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে همز (হুমাযাহ)- এর অর্থ গীবত
অর্থাৎ পশ্চাতে পরনিন্দা করা এবং لمز (‘লুমাযাহ’)-এর অর্থ সামনাসামনি
দোষারোপ করা ও মন্দ বলা।
এ দুটি কাজই জঘন্য গুনাহ।
পেছনে নিন্দা করা ও সামনে দোষ বর্ণনা করা:
তাফসিরবিদদের মতে, এখানে উভয় শব্দ মিলে যে অর্থ দাঁড়ায়
তা হচ্ছে, কাউকে লাঞ্ছিত ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য
করা। কারোর প্রতি তাচ্ছিল্য ভরে ইঙ্গিত করা। চোখের ইশারায় কাউকে ব্যঙ্গ করে কারো বংশের নিন্দা করা। কারো ব্যক্তি সত্তার বিরূপ সমালোচনা করা। কারো মুখের ওপর তার বিরুদ্ধে মন্তব্য করে। কারো পেছনে তার দোষ বলে বেড়াযনো। কোথাও এর কথা ওর
কানে লাগিয়ে বন্ধুদেরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। কোথাও ভাইদের পারস্পরিক ঐক্যে ফাটল ধরানো। কোথাও লোকদের নাম বিকৃত করে খারাপ নামে অভিহিত করা। কোথাও কথার খোঁচায় কাউকে আহত করে এবং কাউকে দোষারোপ করা। এসব কিছু কিছু মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। অথচ এসবই মারাত্মক গোনাহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম তারা, যারা পরোক্ষ নিন্দা করে, বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে এবং নিরপরাধ লোকদের দোষ খুঁজে ফিরে।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৪/২২৭)
অর্থালিপ্সা:
যেসব বদভ্যাসের কারণে এই সূরাতে শাস্তির
কথা উচ্চারণ করা হয়েছে, তারমধ্যে তৃতীয়টি হচ্ছে অর্থালিপ্সা। আয়াতে একে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে— অর্থালিপ্সার কারণে সে তা বার
বার গণনা করে। গুণে গুণে রাখা বাক্য থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কার্পণ্য ও অর্থ লালসার
ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে অন্যান্য আয়াত ও হাদীস সাক্ষ্য
দেয় যে, অর্থ সঞ্চয় করা সর্বাবস্থায় হারাম ও গুনাহ নয়।
তাই এখানেও উদ্দেশ্য সেই সঞ্চয় হবে, যাতে জরুরি হক আদায় করা
হয় না, কিংবা গর্ব ও অহমিকা লক্ষ্য
হয় কিংবা লালসার কারণে দ্বীনের জরুরি কাজ বিঘ্নিত হয়।
এরপরের আয়াতে বলা হয়েছে, যারা সম্পদ জামানোতে ব্যস্ত তারা মনে করে যে, তার অর্থ-সম্পদ তাকে চিরন্তন জীবন দান করবে। অর্থাৎ অর্থ জমা করার এবং তা গুণে রেখে দেবার কাজে সে এত বেশি ব্যস্ত যে নিজের মৃত্যুর কথা তার মনে নেই। তার মনে কখনো এ চিন্তার উদয় হয় না যে, এক সময় তাকে এসব কিছু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে। তাছাড়া তাকে এ সম্পদের হিসাবও দিতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার দু’পা সামনে
অগ্রসর হতে পারবে না যতক্ষণ না
তাকে নিম্নোক্ত বিষয় জিজ্ঞাসা করা না হয়, তার
জীবনকে কিসে নিঃশেষ করেছে; তার জ্ঞান দ্বারা সে কী করেছে;
তার সম্পদ কোত্থেকে আহরণ করেছে ও কিসে ব্যয়
করেছে এবং তার শরীর কিসে খাটিয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস, ২৪১৭)
পরিণতি:
এই তিন জঘন্য
গুনাহের বিবরণের পর আল্লাহ তায়ালা
বলেছেন, এই কৃপণ আর
সম্পদ জমা করা ব্যক্তিরা যেমন ভেবে থাকে তেমনটি কখনো হবে না, বরং তাদের ‘হুত্বামাহ’ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এটাও একটি জাহান্নামের নাম। ‘হুত্বামাহ’ অর্থ, ভেঙ্গে-চুরে ধ্বংস করা।
জাহান্নামের এই আগুন এমন
হবে যে, তা মানুষের হৃদয়কে
পর্যন্ত গ্ৰাস করবে। হৃদয় পর্যন্ত এই আগুন পৌঁছাবার
একটি অর্থ হচ্ছে এই যে, এই
আগুন এমন জায়গায় পৌছে যাবে যেখানে মানুষের অসৎচিন্তা, ভুল আকীদা-বিশ্বাস, অপবিত্র ইচ্ছা, বাসনা, প্রবৃত্তি, আবেগ এবং দুষ্ট সংকল্প ও নিয়তের কেন্দ্র।
(ফাতহুল কাদীর)
এর দ্বিতীয় অর্থ
হচ্ছে, আল্লাহর এই আগুন দুনিয়ার
আগুনের মতো অন্ধ হবে না। সে দোষী ও
নির্দোষ সবাইকে জ্বলিয়ে দেবে না। বরং প্রত্যেক অপরাধীর হৃদয় অভ্যন্তরে পৌছে সে তার অপরাধের
প্রকৃতি নির্ধারণ করবে এবং প্রত্যেককে তার দোষ ও অপরাধ অনুযায়ী
আজাব দেবে।
এর তৃতীয় অর্থ
হচ্ছে, দুনিয়ার আগুন মানুষের দেহে লাগলে হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছার আগেই মৃত্যু হয়ে যায়। জাহান্নামে মৃত্যু নেই। কাজেই জীবিত অবস্থাতেই হৃদয় পর্যন্ত অগ্নি পৌছবে এবং হৃদয়-দহনের তীব্ৰ কষ্ট জীবদ্দশাতেই মানুষ অনুভব করবে।
(তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন ৮/ ৮৫৯, কুরতুবী)
